রাত ৯টা। সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে ভাবলেন, পাঁচ মিনিট একটু বিশ্রাম নেবেন। কিন্তু হঠাৎ খেয়াল করলেন, রাত সাড়ে ১১টা বেজে গেছে। এতক্ষণ নিজের অজান্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট আর ছোট ছোট ভিডিও দেখে সময় কাটিয়েছেন। চোখ জ্বলছে, মস্তিষ্ক তথ্যের চাপে ক্লান্ত, নষ্ট হওয়া সময়ের জন্য অনুশোচনাও হচ্ছে। তারপরও হাত থেকে ফোন নামছে না।
এটি কেবল ইচ্ছাশক্তির অভাব নয়। মনোবিজ্ঞানে এ ধরনের অনবরত স্ক্রল করার প্রবণতাকে ‘ডুমস্ক্রলিং’ বলা হয়। এতে বিরক্তি ও মানসিক ক্লান্তি তৈরি হলেও ব্যবহারকারী বারবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফিড বা ছোট ভিডিও দেখতে থাকেন।
এই অভ্যাসের পেছনে মস্তিষ্কের পুরস্কারপ্রাপ্তির প্রক্রিয়া এবং ‘অনিশ্চিত পুরস্কার’ বা রিওয়ার্ড আনসার্টেনটি কাজ করে। স্নায়ুবিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, প্রতিবার স্ক্রল করার পর নতুন কোনো আকর্ষণীয় বিষয় পাওয়ার সম্ভাবনা মস্তিষ্ককে বারবার ফোনের দিকে টানে। সহজলভ্য ও তাৎক্ষণিক আনন্দের এই ধারাবাহিকতায় তৈরি হয় ‘সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্লান্তি’। একপর্যায়ে ফোন নামিয়ে রাখার ইচ্ছা থাকলেও তা বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, দিনের ব্যস্ততায় নিজের জন্য সময় না পাওয়ার ক্ষতিপূরণ হিসেবে রাতে জেগে থাকার প্রবণতাও এ অভ্যাসকে বাড়িয়ে দিতে পারে। একে বলা হয় ‘রিভেঞ্জ বেডটাইম প্রোক্রাস্টিনেশন’। অর্থাৎ, দিনের ব্যস্ততা ও নিয়ন্ত্রণহীনতার অনুভূতি থেকে নিজের জন্য কিছুটা সময় বের করতে অনেকে ইচ্ছাকৃতভাবে ঘুমাতে দেরি করেন। ফলে অতিরিক্ত ক্লান্তি থাকা সত্ত্বেও রাতের অনেকটা সময় ফোনে স্ক্রল করে কাটে।
তবে এ চক্র থেকে বের হতে শুধু ইচ্ছাশক্তির ওপর নির্ভর করলে চলবে না। বরং ফোন ব্যবহারের পরিবেশ ও অভ্যাসে কিছু বাস্তব পরিবর্তন আনতে হবে।
অতিরিক্ত স্ক্রলিংয়ের অভ্যাস থেকে মুক্তির পাঁচ উপায়
ফোনের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে সময় ও মানসিক প্রশান্তি ফিরে পেতে কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।
১. রাতে ফোন দূরে রাখুন: ঘুমাতে যাওয়ার আগে ফোনটি বিছানা থেকে দূরে কোনো বাক্স, ড্রয়ার বা আলমারিতে রেখে দিন। প্রয়োজনে অ্যালার্ম দেওয়ার জন্য প্রচলিত অ্যালার্ম ঘড়ি ব্যবহার করুন। ফোন হাতে পেতে বিছানা ছেড়ে উঠতে হলে অপ্রয়োজনীয় স্ক্রলিংয়ের প্রবণতা কমানো সহজ হতে পারে।
২. ফোনের পর্দা সাদাকালো করে রাখুন: ফোনের অ্যাক্সেসিবিলিটি সেটিংস থেকে গ্রেস্কেল বা সাদাকালো প্রদর্শন চালু করুন। এতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অ্যাপের উজ্জ্বল রং এবং আকর্ষণীয় দৃশ্যের আবেদন কমে যায়। ফলে দীর্ঘ সময় পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকার আগ্রহও কমতে পারে।
৩. ঘরের কিছু জায়গাকে ফোনমুক্ত রাখুন: শোবার ঘর, খাবার টেবিল ও বিশ্রামের জায়গাকে ফোন ব্যবহারের বাইরে রাখুন। এসব স্থানে ফোন ব্যবহার না করার নিয়ম করলে ধীরে ধীরে সেগুলো বিশ্রাম ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের জন্য নির্ধারিত রাখা সম্ভব হবে।
৪. অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ করুন: যেসব অ্যাপের বিজ্ঞপ্তি জরুরি নয়, সেগুলোর নোটিফিকেশন বন্ধ রাখুন। বিশেষ করে লাল রঙের নোটিফিকেশন চিহ্ন বারবার ফোন পরীক্ষা করার প্রবণতা বাড়াতে পারে। অপ্রয়োজনীয় বিজ্ঞপ্তির সংখ্যা কমলে ফোন হাতে নেওয়ার তাগিদও কমতে পারে।
৫. ক্লান্তির সময় বিকল্প অভ্যাস গড়ে তুলুন: ক্লান্ত হলে মস্তিষ্ক দ্রুত স্বস্তি পাওয়ার উপায় খোঁজে। এ সময় ফোনের পরিবর্তে স্বাস্থ্যকর কিছু অভ্যাস বেছে নেওয়া যেতে পারে। যেমন—মনোযোগ দিয়ে এক কাপ চা পান করা, পাঁচ মিনিট হালকা শরীরচর্চা বা স্ট্রেচিং করা কিংবা কাগজের বইয়ের দুই পৃষ্ঠা পড়া।
স্মার্টফোন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় উপকরণ। তবে সেটি যেন আমাদের সময় ও মানসিক প্রশান্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে না পারে। ফোন ব্যবহারে সচেতন সীমারেখা তৈরি এবং ছোট ছোট অভ্যাসের পরিবর্তনের মাধ্যমেই অতিরিক্ত স্ক্রলিংয়ের চক্র থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব।
আপনার কমেন্ট